
শেখ হাসিনা বলেন, শুধুমাত্র একটা নির্মাণ কাজের জন্য যেন নির্মাণ করা না
হয়, এটা আমার অনুরোধ। একটা কনষ্ট্রাকশন হলে কিছু লোক কাজ পাবেন কিছু কমিশন
বা কিছু লোক নানা সুবিধা পাবেন সেটা যেন না হয়।
তিনি বলেন, ‘এর জন্য আমি আমার পার্লামেন্টারি পার্টির এমপিদেরও নির্দেশ
দিয়েছি। সংসদে বলেছি, একনেক সভাসহ সব জায়গায় বলেছি। আর সে রকম যদি কোন
প্রকল্প দেখি অবশ্যই আমি তা অনুমোদন করবো না। যেটা আমার দেশের কাজে লাগবে,
মানুষের কাজে লাগবে আর যে প্রকল্প শেষ করলে পরে তার থেকে দেশ কিছু লাভবান
হবে, মানুষ লাভবান হবে, আমাদের উপার্জন হবে সেভাবেই যেন পরিকল্পনা করা হয়।
এটাই আমার কাম্য।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত প্রকৌশলীদের যৌক্তিক দাবিগুলো দেশের উন্নয়নে তাদের
অবদানের কথা মাথায় রেখেই তিনি যাচাই বাছাই পূর্বক পূরণের ব্যবস্থা নেবেন
বলেও আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্তরের প্রকৌশলী, কেন্দ্র, উপকেন্দ্র, প্রকৌশল বিভাগ
এবং এএমআইই পরীক্ষার স্নাতকদের হাতে স্বর্ণপদক ও সনদসহ পুরস্কার তুলে দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আরও অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে
আপনারা (প্রকৌশলীগণ) বিশেষভাবে অবদান রাখতে পারবেন, আমরা সেটা আশা করি।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে এই বাংলাদেশ যাতে আরো উন্নত হয়
সে জন্য যা যা করণীয় আমরা তা করেছি। ইতোমধ্যে ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা-২০২১’
আমরা বাস্তবায়ন করেছি এখন ২০২১ থেকে ২০৪১ প্রণয়ন করে সেটাও আমাদের
পঞ্চবার্র্ষিক পরিকল্পনা সঙ্গে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আর জাতিসংঘ ঘোষিত
এসডিজি পরিকল্পনা ২০৩০ও একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এ সময় ২০৪১ সালের বাংলাদেশ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ হিসেবে গড়ে উঠবে উল্লেখ করে
সরকার প্রধান বলেন, সেখানে ‘স্মার্ট জনসংখ্যা’, ‘স্মার্ট সরকার’, ‘স্মার্ট
অর্থনীতি’ এবং ‘স্মার্ট সমাজ’ প্রতিষ্ঠিত হবে। সেভাবেই আমরা বাংলাদেশকে গড়ে
তুলবো।
শেখ হাসিনা বলেন, সেটা করার জন্য আমি প্রকৌশলীদের বলবো আপনারা আপনাদের মেধা
ও মনন দিয়ে পরিকল্পনা কী নেওয়া যায়? কীভাবে এগুনো যায়? কোন কোন খাতকে আমরা
আরো অগ্রাধিকার দিতে পারি - সেক্ষেত্রে আপনাদের পরামর্শ চাই। যেটা আমাদের
কাজে লাগবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এখন একটি গ্লোবাল ভিলেজ। কাজেই বিশ্বের সাথে
আমাদের তাল মিলিয়ে চলতে হবে। বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে চলতে হবে। সেইভাবে
আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। সেইভাবেই আমি পরিকল্পনা করছি।
আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি এবং ২০২৬ সাল থেকে তা বাস্তবায়ন শুরু
হবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, কাজেই এখন থেকেই এর জন্য যথাযথ পরিকল্পনা
আমরা নিচ্ছি। কিন্তু, এখান থেকে যে সুযোগগুলো আমরা পাব সে গুলো যথাযথভাবে
আমাদের কাজে লাগাতে হবে। আর যে চ্যালেঞ্জগুলো আসবে সেগুলো আমাদের মোকাবেলা
করতে হবে এবং আমরা তা পারবো। কাজেই এখন থেকেই আমাদের সে প্রস্তুতি নিতে
হবে।
তাঁর সরকার সবসময়ই চায় কীভাবে দেশের মানুষ ভাল থাকবে এবং তাদের জীবন মান
উন্নত হবে উল্লেখ করে দেশের উন্নয়ন যাদের চোখে পড়েনা সেই বিশেষ গোষ্ঠীর
সমালোচনাও করেন তিনি।
সরকার প্রধান বলেন, আমি অবাক হয়ে যাই আমাদের দেশের কিছু কিছু মানুষ আছেন
আপনি যাই করেন, কিছুই তাদের ভাল লাগে না। ‘কিছু ভাল লাগে না’ একটা গোষ্ঠীই
রয়েছে। যেমন-কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন পদ্মা সেতুতে রেল যোগাযোগের কী দরকার ছিল
বা স্যাটেলাইট-২ এরই বা প্রয়োজন কি আছে? পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র কেন করা
হলো? শুধু শুধ টাকা নষ্ট। মেট্রো রেলের তো প্রয়োজনই ছিল না। ৩০ হাজার কোটি
টাকা দিয়ে মেট্রোরেল না করে ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করলেই তো যানজট দূর হয়ে
যেত।
তিনি এ সময় বিশ্বব্যাংকের ভূয়া দুর্নীতির অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে তাদের
চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উল্লেখ করে
বলেন, অনেকেই বলেছিলেন বিশ্বব্যাংক ছাড়া হবে না। কিন্তু আমরা নিজের অর্থে
পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি যে আমরাও পারি। জাতির পিতা
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন ‘বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবানা’
আমাদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারেনি।
শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নে প্রকৌশলীদের গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দেশে এখন ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে যা আমরা ২০৪১ সাল নাগাদ ৬০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করতে চাই। সেক্ষেত্রে আমি বলবো আমাদের প্রকৌশলীদেরও গবেষণা দরকার। আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বহুমুখি করেছি আগামীতে আরেকটি দিক আসছে হাইড্রোজেন। হাইড্রোজেন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও আমাদের গবেষণা দরকার। একই সঙ্গে স্বল্প খরচে টেকসই যন্ত্রপাতি নির্মাণ, স্থাপনা নির্মাণ ও মেরামতেও গবেষণা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রকৌশল ক্ষেত্রে আরো বেশি গবেষণা করে-আপনাদের যে
উদ্ভাবনী শক্তি ও মেধা রয়েছে সেটাকে কীভাবে আমরা দেশের কাজে লাগাতে পারি সে
দিকে আপনারা বিশেষ দৃষ্টি দেবেন। কারণ, আমাদের সবকিছুই নির্মাণের দায়িত্ব
পড়ে প্রকৌশলীদের ওপর।’
শেখ হাসিনা এ সময় তাঁর সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ
নির্বিশেষে অতি দরিদ্রদের জন্য ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ায় আন্তরিকতার
সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রকৌশলীদের ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, ‘এখানে প্রশাসন থেকে প্রকৌশলী এমনকী সংশ্লিষ্ট সকলেই আন্তরিকতার
সঙ্গে কাজ করেছেন। যার জন্য আজ ২১টি জেলা এবং ৩৩৪টি উপজেলাকে
ভূমিহীন-গৃহহীণ মুক্ত ঘোষণা দিতে পেরেছি। ইনশাল্লাহ এই বাংলাদেশে একটি
পরিবারও ভূমিহীন-গৃহহীণ থাকবে না।’
আরো অল্প খরচে এই সাধারণ মানুষগুলোর জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও সুন্দরভাবে
বসবাস উপযোগী আবাসস্থল নির্মাণে কারো যদি কোন পরামর্শ বা পরিকল্পনা থাকে তা
দেওয়ার জন্যও তিনি প্রকৌশলীদের প্রতি আহবান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, বিত্তশালীরা কেবল নয়, আমি চাই আমার রিকশাওয়ালা, সাধারণ
খেটে খাওয়া মানুষসহ দিন মজুররাও ফ্লাটে থাকবে। আমার প্রত্যেকটি কাজ হচ্ছে
এই তৃণমুল মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। একথা মাথায় রেখেই আপনারা আপনাদের
দায়িত্ব পালন করবেন। দেখবেন নিজেদেরও ভালো লাগবে।
জাতির পিতার কন্যা বলেন, আমরা প্রত্যেকটা পদক্ষেপ নিচ্ছি বাংলাদেশকে
আর্থ-সামাজিক উন্নতি করে উন্নত-সমৃদ্ধ ‘স্মার্ট সোনার বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার
লক্ষ্য নিয়ে। সেখানে মূল চালিকা শক্তি হবে আমাদের প্রকৌশলী বৃন্দ। কাজেই
আপনাদের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব আমাদের। সেটা আমরা করবো।