SaghataNews.Com- সাঘাটা নিউজ

গাইবান্ধায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ পলো

গাইবান্ধায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ পলো


অনলাইন ডেস্ক: একসময় গ্রামবাংলার জলজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল পলো। বর্ষা শেষে যখন মাঠ-ঘাট, বিল ও নিম্নাঞ্চলের পানি কমে আসত, তখন শুরু হতো পলো দিয়ে মাছ ধরার উৎসব। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে গাইবান্ধা জেলার সেই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে পলো এখন যেন শুধুই স্মৃতির নাম।   

জেলার সাতটি উপজেলাজুড়ে একসময় পলো ছিল মাছ ধরার অন্যতম প্রধান উপকরণ। বিশেষ করে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা, সাদুল্ল্যাপুর উপজেলা এবং পলাশবাড়ী উপজেলা-এর বিস্তীর্ণ বিল ও নিচু জমিগুলোতে ফাগুন ও চৈত্র মাসে পানি কমে গেলে দলবেঁধে মানুষ পলো নিয়ে নামত মাছ ধরতে। 

সেই দৃশ্য ছিল উৎসবের মতো আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর মিলনমেলায় ভরা। উৎসবের মতো পলো বাওয়া ৯০-এর দশকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই হাট-বাজারে ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা দেওয়া হতো আগামীকাল অমুক বিলে পলো বাওয়া হবে। সেই খবর শুনে গ্রামের মানুষ পরদিন ভোরেই জড়ো হতো। 

ছোট-বড় সবাই অংশ নিত এই আনন্দঘন আয়োজনে। পলো হাতে পানিতে নামার পর শুরু হতো এক ভিন্ন রকম প্রতিযোগিতা। কে কত মাছ ধরতে পারে এই নিয়ে ছিল উৎসাহ আর উত্তেজনা। পলো দিয়ে ধরা পড়ত শৈল, বোয়াল, টাকি, রুই, মাগুর ও গজারের মতো দেশি মাছ।  

অনেকেই তখন গান গাইত, জারি-সারি তুলত ঝপ ঝপাঝপ পলো বাও মজার মজার মাছ খাও। গ্রামের এই প্রাণবন্ত দৃশ্য আজ আর চোখে পড়ে না। স্মৃতির ভেতর হারানো দিন পাকুরিয়া বিল-এর আশপাশের বাসিন্দা এবারত আলী আক্ষেপ করে বলেন, সেই দৃশ্য এখন আর কোথায় পাবেন? পলো নিয়ে দলবেঁধে মাছ ধরা, গান গাওয়া সবই যেন গল্প হয়ে গেছে। মনে হলেই শৈশবে ফিরে যাই।  

কেন হারিয়ে যাচ্ছে পলো স্থানীয়দের মতে, পলো বিলুপ্তির পেছনে রয়েছে নানা কারণ। বিল ও জলাশয় কমে যাওয়া আধুনিক মাছ ধরার প্রযুক্তির ব্যবহার বাণিজ্যিক মাছ চাষের বিস্তার প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তন আগে যেখানে প্রাকৃতিকভাবে মাছ পাওয়া যেত, এখন সেখানে কৃত্রিম চাষ নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে পলো দিয়ে মাছ ধরার প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে।  

শুধু একটি যন্ত্র নয়, একটি সংস্কৃতি পলো ছিল শুধু মাছ ধরার উপকরণ নয় এটি ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতি, ঐক্য ও আনন্দের প্রতীক। পলো বাওয়ার মাধ্যমে মানুষ একসঙ্গে সময় কাটাত, সম্পর্ক গড়ে উঠত, আর গ্রামীণ জীবনে আসত এক ভিন্ন স্বাদ।  এখনই প্রয়োজন সংরক্ষণ সচেতন মহলের মতে, এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন উদ্যোগ। গ্রামীণ উৎসব হিসেবে পলো বাওয়া পুনরুজ্জীবন, জলাশয় সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মকে এ সম্পর্কে জানানো জরুরি।  

নইলে খুব শিগগিরই পলো শব্দটি বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু গল্পেই শুনবে কখনো গ্রামবাংলায় এমন এক আনন্দঘন মাছ ধরার উৎসব ছিল। গাইবান্ধার গ্রামাঞ্চলে পলো আজ হারিয়ে যেতে বসেছে, কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে এখনো জীবন্ত সেই দিনগুলো যেখানে জল, মাছ আর মানুষের হাসি মিলেমিশে তৈরি করত এক অপার আনন্দের পৃথিবী।

নবীনতর পূর্বতন